মারিয়ানা ট্রেঞ্চের দানব: পৃথিবীর গভীরতম খাদে লুকিয়ে থাকা ১০টি ভয়ংকর রহস্য যা বিজ্ঞান আজও ব্যাখ্যা করতে পারেনি
আমরা জানি চাঁদের বুকে পা রেখেছে মানুষ, মঙ্গল গ্রহে পাঠিয়েছে রোভার। অথচ আমাদের নিজের গ্রহের ৮০ শতাংশ সমুদ্র এখনও অমীমাংসিত। আর এই অমীমাংসিতের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ও রহস্যময় জায়গার নাম মারিয়ানা ট্রেঞ্চ (Mariana Trench)।
প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এই গভীর খাতটির নামকরণ করা হয়েছে স্পেনের রানি মারিয়ানার নামে। এর গভীরতা এত বেশি যে, পুরো মাউন্ট এভারেস্টকে যদি এর ভেতরে ফেলা হয়, তাহলে উপরে আরও দুই কিলোমিটার জায়গা ফাঁকা থাকবে!
এই অন্ধকার, চাপ আর নীরবতার রাজ্যে কি লুকিয়ে আছে কোনো দানব? বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে খুঁজছেন উত্তর। কিন্তু প্রতিবারই নতুন প্রশ্ন ফিরে পাচ্ছেন। আজ আমরা জানবো মারিয়ানা ট্রেঞ্চের সেই ১০টি ভয়ংকর রহস্যের কথা—যা আজও অমীমাংসিত, আজও আতঙ্কিত করে তোলে সমুদ্রবিজ্ঞানীদের।
রহস্য ১: ১৯৬০ সালের সেই দানবের দেখা
১৯৬০ সালের ২৩ জানুয়ারি। ইতিহাসের সবচেয়ে সাহসী দুই মানুষ—জ্যাক পিকার ও ডন ওয়ালশ—নেমে পড়লেন সমুদ্রের তলদেশে। তাদের যানবাহনের নাম বাথিস্কাপ ট্রিয়েস্তে।
তারা নেমেছিলেন মারিয়ানা ট্রেঞ্চের সবচেয়ে গভীর বিন্দু চ্যালেঞ্জার ডিপ-এ (Challenger Deep)। গভীরতা প্রায় ১১ কিলোমিটার। চাপ এত বেশি যে, কোনো ধাতব বস্তু সেখানে পিষে গুঁড়ো হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু হঠাৎ—ঘটলো অঘটন।
প্রায় ৯ কিলোমিটার গভীরে পৌঁছানোর পর হঠাৎ ট্রিয়েস্তে কেঁপে উঠল। বাইরের ক্যামেরায় দেখা গেল—একটি দৈত্যাকার প্রাণী! আকৃতি প্রায় ২০-৩০ ফুট লম্বা। চোখ দুটি জ্বলজ্বল করছে। মুখের ভেতর ধারালো দাঁতের সারি।
জ্যাক পিকার পরবর্তীতে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "এটা কোনো সাধারণ মাছ ছিল না। এটা ছিল দানব। আমাকে কাঁপিয়ে তুলেছিল।"
কয়েক মিনিট পর সেই প্রাণী অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। ট্রিয়েস্তে নিরাপদে ফিরে এল। কিন্তু প্রশ্ন থেকে গেল—এত চাপে কীভাবে বাঁচে সেটা? এত গভীরে তার খাবার কী?
বিজ্ঞানীরা বললেন, 'ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশন'। কিন্তু পিকার ও ওয়ালশ সারাজীবন দাবি করে গেছেন—যা দেখেছেন, তা বাস্তব।
আজও অমীমাংসিত—মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে কী লুকিয়ে আছে?
রহস্য ২: ২৫ বছর পর অদৃশ্য টান
১৯৮৫ সালে জার্মানির গবেষণা জাহাজ ‘সোনে’ চ্যালেঞ্জার ডিপে নামায় এক যন্ত্র। যন্ত্রটি ছিল পাঁচ ফুট লম্বা, ভারী ধাতুর তৈরি। নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ট্রল’।
কাজ ছিল সহজ—সরাসরি তলদেশে পৌঁছে মাটির নমুনা সংগ্রহ করা। কিন্তু ট্রল যখন প্রায় ৮ কিলোমিটার গভীরে পৌঁছালো, তখন হঠাৎ রেকর্ডিং সরঞ্জামে দেখা গেল—একটি অদ্ভুত শব্দ। দীর্ঘ, গভীর, কম্পন তৈরি করা এক ধরণের ‘গর্জন’।
তারপর ট্রল থেমে গেল। টেনে ওঠার চেষ্টা করলেও, যেন কেউ টেনে ধরে রেখেছে। নাবিকরা বললেন, “মনে হচ্ছে নিচে কেউ আছে, যে চাচ্ছে না আমরা কিছু নিয়ে যাই।”
কষ্টে ট্রল উপরে তোলা গেল। কিন্তু তাতে কিছু নমুনা ছিল না। বরং দেখা গেল ধাতব অংশে বড় বড় দাঁতের চিহ্ন!
যে প্রাণীটি এত গভীরে ট্রলের মতো লোহার বস্তু কামড়াতে পারে—সেটা কত বড় হতে পারে? বিজ্ঞানীদের হিসেব অনুযায়ী, অন্তত ৪০-৫০ ফুট লম্বা।
মারিয়ানা ট্রেঞ্চের দানব কি আসলেই এত বড়?
রহস্য ৩: মেগালোডনের ফিরে আসার আশঙ্কা
মেগালোডন (Megalodon)—প্রাগৈতিহাসিক এক হাঙ্গর, যা প্রায় ২ কোটি বছর আগে সমুদ্রে রাজত্ব করত। দৈর্ঘ্য ৬০ ফুটের বেশি। দাঁতের আকার মানুষের হাতের সমান।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রায় ২৫ লাখ বছর আগে মেগালোডন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু কেউ কেউ বলেন—না, তারা বিলুপ্ত হয়নি; তারা লুকিয়ে আছে গভীর সমুদ্রে।
মারিয়ানা ট্রেঞ্চের মতো জায়গায় যদি মেগালোডন বেঁচে থাকে, তাহলে সেটি সম্ভব। কারণ ওই গভীরতায় চাপ বেশি, খাবার কম—বড় প্রাণীর পক্ষে টিকে থাকা কঠিন। কিন্তু মেগালোডন যদি ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায়?
২০১৩ সালে ডিসকভারি চ্যানেলের ‘মেগালোডন: দ্য মনস্টার শার্ক লিভস’ অনুষ্ঠানটি সারা পৃথিবীতে আলোড়ন ফেলে দেয়। অনেকেই বিশ্বাস করে, মারিয়ানা ট্রেঞ্চের অন্ধকারেই লুকিয়ে আছে এই দানব।
এখনও পর্যন্ত মেগালোডনের জীবন্ত কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু গভীর সমুদ্রের ৯৫ শতাংশই অনাবিষ্কৃত। তাই উড়িয়ে দেওয়ার মতো বিষয়ও নয়।
রহস্য ৪: জাপানের রহস্যময় ‘মেরু দানব’
জাপানের কাছে ‘মেরু দানব’ (Pole Monster) নামে একটি প্রাণীর গল্প বহু পুরনো। জেলেরা বলে, এই প্রাণী দেখতে সাপের মতো, লম্বায় ১০০ ফুটের বেশি। চামড়া পিচ্ছিল ও কালো। চোখ বড় বড় ও লাল।
অনেক জেলে দাবি করেন, মারিয়ানা ট্রেঞ্চের কাছাকাছি এলাকায় তারা এই প্রাণী দেখেছেন। জাপানের ‘মিনাতো’ গ্রামের এক বৃদ্ধ জেলে বলেছিলেন, “আমার বাবা দেখেছিলেন। বাবা বলতেন, এটা সমুদ্রের দেবতা। যারা অশুদ্ধ, তাদের টেনে নিয়ে যায় গভীরে।”
১৯৭৭ সালে জাপানি ট্রলার ‘জুইয়ো মারু’ দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে এক অদ্ভুত মৃত প্রাণী তুলেছিল। লম্বায় প্রায় ৩০ মিটার। ওজন প্রায় দুই টন। বিজ্ঞানীরা বললেন, এটা পচা তিমির মাংস। কিন্তু জাপানি জেলেরা মানতে রাজি নন।
প্রাণীটির ছবি আজও ইন্টারনেটে ‘জুইয়ো মারু মনস্টার’ নামে ঘুরে বেড়ায়।
এখন প্রশ্ন—মারিয়ানা ট্রেঞ্চের দানব ও জাপানের মেরু দানব—একই প্রাণী কি না? উত্তর অজানা।
রহস্য ৫: ২০১২ সালের জেমস ক্যামেরনের একাকী অভিযান
২০১২ সালের ২৫ মার্চ। ‘টাইটানিক’ ও ‘অ্যাভাটার’ খ্যাত পরিচালক জেমস ক্যামেরন একাই নেমে যান মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে। এটি ছিল ইতিহাসের দ্বিতীয় ঘটনা, যখন কেউ একা সেখানে গেলেন।
ক্যামেরন ৭ ঘণ্টা কাটিয়েছিলেন তলদেশে। তিনি আশা করেছিলেন, নতুন কিছু প্রাণী দেখতে পাবেন। ফিরে এসে তিনি বলেন, “একটা প্রাণীও দেখিনি। শুধু পলি, পাথর ও নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতর একটা শব্দ পেয়েছি। সেটা কম্পনের মতো। যেন কেউ খুব কাছে শ্বাস নিচ্ছে।”
সেই শব্দের উৎস কী? ক্যামেরন ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ওই গভীরে হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট থেকে কম্পন তৈরি হয়। কিন্তু ক্যামেরন জোর দিয়ে বলেন, “এটা যান্ত্রিক নয়। জৈবিক কিছু ছিল।”
আজও সেই ‘শ্বাসের’ রহস্য অমীমাংসিত।
রহস্য ৬: ‘দ্যা ব্লু হোল’ ও সময়ের গোলকধাঁধা
মারিয়ানা ট্রেঞ্চের কাছে ‘দ্যা ব্লু হোল’ (The Blue Hole) নামে একটি জায়গা আছে। এখানে সমুদ্রের রং এত গাঢ় নীল যে মনে হয় কালো। জেলেরা এড়িয়ে চলে এই জায়গা।
গল্প আছে, এখানে নোঙর ফেললে টান লাগে। যেন কেউ টেনে নিচ্ছে। আবার কখনো কখনো পুরনো জাহাজের ধ্বংসাবশেষ ভেসে ওঠে সাগরের উপরে—যা কয়েক শ বছর আগে ডুবে গিয়েছিল।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘ব্লু হোল’ আসলে প্রাচীন কোনো গুহা, যা পানিতে ডুবে গেছে। এর ভেতরের স্রোত এত শক্তিশালী যে টেনে নিয়ে যায় সবকিছু।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এত গভীরে যাওয়ার পর পুরনো জাহাজ কীভাবে ফিরে আসে উপরে? উত্তর নেই।
রহস্য ৭: লাল বামন মাছ ও অদ্ভুত অভিযোজন
২০১৪ সালে এক গবেষণায় দেখা যায়, মারিয়ানা ট্রেঞ্চের প্রায় ৮ কিলোমিটার গভীরে ‘লাল বামন মাছ’ (Red Dwarf Fish) বাস করে। এরা এত ছোট যে হাতের তালুতে ধরা যায়। কিন্তু তাদের দেহ এত শক্ত যে সেখানে চাপের কোনো প্রভাব পড়ে না।
বিজ্ঞানীরা বিস্মিত—এত চাপেও কীভাবে তাদের হাড় ভাঙে না? উত্তর মেলেনি।
তাছাড়া এই মাছের শরীরে বায়োলুমিনেসেন্স (নিজে আলো তৈরি করার ক্ষমতা) রয়েছে। কিন্তু এত গভীরে আলোর কী প্রয়োজন?
গবেষকরা মনে করেন, সম্ভবত শিকার ধরা বা সঙ্গী আকর্ষণের জন্য। কিন্তু সেটাও নিশ্চিত নয়।
রহস্য ৮: কদম্ব ফুলের গন্ধ?
এটি শুনতে অবিশ্বাস্য। বহু নাবিক ও গবেষক দাবি করেছেন, মারিয়ানা ট্রেঞ্চের কাছাকাছি এলাকায় সমুদ্রের জল কদম্ব ফুলের মতো গন্ধ পায়।
রসায়নবিদরা বলছেন, নির্দিষ্ট ধরণের শৈবাল বা ব্যাকটেরিয়া এই গন্ধ তৈরি করতে পারে। কিন্তু ওই গভীরে ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব খুবই সীমিত।
তাহলে এই গন্ধ কোথা থেকে আসে? এটি নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
রহস্য ৯: ‘দ্যা লাস্ট কল’—রেডিও সিগন্যালের রহস্য
১৯৯৭ সালে এক জাপানি গবেষণা জাহাজ মারিয়ানা ট্রেঞ্চের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটি অজানা রেডিও সিগন্যাল পায়। সিগন্যালটি নাকি বাংলা, হিন্দি ও আরবি মিশ্রিত এক ভাষায় ছিল।
জাপানি বিজ্ঞানীরা ভাষাটি বুঝতে পারেননি। সিগন্যালটি ৭ মিনিট ধরে চলেছিল। তারপর হঠাৎ বন্ধ।
অনেকেই মনে করেন, এটি কোনো বিদেশি জাহাজ বা সাবমেরিনের সিগন্যাল। কেউ কেউ বলেন, এটি ‘দানবের গর্জন’। আসলে কী ছিল—তা আজও রহস্য।
রহস্য ১০: যন্ত্র সত্ত্বেও নেমে আসা অদৃশ্য আতঙ্ক
এখন পর্যন্ত চারবার মানুষ বা যন্ত্র পাঠানো হয়েছে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে। প্রতিবারই অভিযান শেষে গবেষকরা বলেছেন—নিচের পরিবেশ ‘ভয়ংকর ও অস্বাভাবিক’।
বিশেষ করে ২০০৯ সালে ‘নেরিয়াস’ (Nereus) নামের ডুবোযন্ত্রটি সেখানে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। কারণ চাপ। কিন্তু অন্য যন্ত্রগুলো কেন টিকে গেল?
গবেষকরা মনে করেন, নিচে এমন কিছু আছে যা যন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলে। সেটা চুম্বকীয় ঢেউ হতে পারে, আবার কোনো প্রাণীর হামলাও হতে পারে।
যাই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট—মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশ যতবার আমরা ছুঁতে যাই, ততবার নতুন প্রশ্ন হাতে পাই।
উপসংহার: দানব কি বাস্তব?
মারিয়ানা ট্রেঞ্চের দানব নিয়ে প্রশ্নটা আসলে অনেক বড়। এটা শুধু ‘বড় মাছ’ বা ‘দানব’–এর প্রশ্ন নয়, বরং প্রশ্ন হলো—আমরা কি জানি নিজের গ্রহকে পুরোপুরি?
উত্তর: না।
আমরা সমুদ্রের ৫ শতাংশেরও কম অন্বেষণ করেছি। ৯৫ শতাংশ এখনও অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারেই লুকিয়ে থাকতে পারে অসংখ্য অজানা প্রাণী, যার মধ্যে ‘দানব’ শুধু একটি নাম।
জ্যাক পিকার, ডন ওয়ালশ, জেমস ক্যামেরন—তারা সবাই একমত: মারিয়ানা ট্রেঞ্চ নীরব নয়। সেখানে কিছু বাস করে। সেটা দানব হোক আর অদৃশ্য শক্তি হোক—তা আমাদের জানা নেই।
তবে যতদিন না আমরা সেটা জানতে পারছি, ততদিন ‘মারিয়ানা ট্রেঞ্চের দানব’ বেঁচে থাকবে আমাদের কল্পনায়, বিজ্ঞানের প্রশ্নবোধক চিহ্নে আর রহস্যের সেই চিরন্তন জ্বলন্ত আগুনে।
আপনি কি বিশ্বাস করেন সেখানে দানব আছে? কমেন্টে জানান।
আর এই রহস্য ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গেও ভাগ করুন।
Please login to comment
No comments yet. Be the first to comment!