বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার ও ইতিহাস: সাহাবী থেকে সুলতান পর্যন্ত

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার ও ইতিহাস: সাহাবী থেকে সুলতান পর্যন্ত

বাংলাদেশের মানুষ ইসলাম ধর্মকে গ্রহণ করেছে শান্তি ও প্রেমের বাণী হিসেবে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মুসলিম জনবহুল দেশ, যেখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯১.০৪ শতাংশ মুসলমান । কিন্তু কবে, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে এই ভূখণ্ডে ইসলামের আগমন ঘটেছিল? অনেকের ধারণা, ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের (১২০৪ খ্রি.) মাধ্যমেই এদেশে ইসলাম আসে। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। চলুন জেনে নেওয়া যাক বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের সেই প্রাচীন ইতিহাস।
সাহাবীদের হাতে ইসলামের সূচনা (৬২০-৬২৬ খ্রি.)

বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ঘটে খিলজীর বিজয়ের প্রায় ৬০০ বছর আগেই। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণা ও শিলালিপি থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় বা তাঁর ইন্তেকালের অল্প কিছুদিন পরেই এই অঞ্চলে ইসলামের স্পর্শ পৌঁছেছিল।

রংপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মামা এবং মা আমিনার চাচাতো ভাই হযরত আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনু ওহাইব (রা.) ৬২০ থেকে ৬২৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করেন । ধারণা করা হয়, তিনিই প্রথম এই অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলো লালমনিরহাটের প্রাচীন মসজিদ। ১৯৮৭ সালে লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের 'মজেদের আড়া' গ্রামে জঙ্গল খননের সময় একটি প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। সেখানে আবিষ্কৃত একটি ইটে আরবি ভাষায় কালেমা তাইয়্যেবা এবং 'হিজরি ৬৯' (৬৯০ খ্রিস্টাব্দ) লেখা ছিল । এটি প্রমাণ করে যে, এই মসজিদটি হিজরি ৬৯ সালে নির্মিত বা সংস্কার করা হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের প্রথম মসজিদের ইতিহাস ৬৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা খিলজীর বিজয়ের প্রায় পাঁচ শতক আগের।

ঐতিহাসিকদের মতে, আরব-চীন বাণিজ্যপথে যাতায়াতকালে সাহাবিরা বাংলাদেশের বন্দরগুলোতে নোঙর করতেন এবং এখানকার মানুষদের ইসলামের দাওয়াত দিতেন। এদের মধ্যে হযরত আবু ওয়াক্কাস (রা.) ছাড়াও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ইতবান (রা.), হযরত আসেম ইবনে আমর আততামীমী (রা.) প্রমুখ সাহাবির আগমনের সন্ধান পাওয়া যায় ।
আরব বণিকদের মাধ্যমে ইসলামের প্রসার

সাহাবীদের পরবর্তী সময়ে আরব মুসলিম বণিকরা এদেশে ইসলাম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। জাহিলিয়াত যুগ থেকেই আরব বণিকদের সঙ্গে প্রাচীন বাংলার বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর তারা মুসলিম বণিক হিসেবে এই সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং বাণিজ্যের পাশাপাশি ইসলাম প্রচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ।

আরব ভূগোলবিদ ইবনে খুরদাদবিহ ও আল-ইদ্রিসীর বর্ণনায় চাঁদপুরের নদীবন্দর এবং মেঘনার মোহনায় আরব বণিকদের আগমনের কথা উল্লেখ রয়েছে । বণিকরা চন্দন কাঠ, হাতির দাঁত, মসলা ক্রয়ের জন্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে আসতেন এবং সেখানকার অধিবাসীদের মধ্যে ইসলামের বাণী প্রচার করতেন।

আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশীদের আমলে (৭৮৮ খ্রি.) তৈরি দুটি আরবি মুদ্রা রাজশাহীর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার খননকালে পাওয়া যায়। একইভাবে কুমিল্লার ময়নামতিতেও আব্বাসীয় যুগের মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে । এই মুদ্রাগুলো প্রমাণ করে যে, অষ্টম-নবম শতকে এ অঞ্চলে আরব মুসলমানদের নিয়মিত যাতায়াত ও বসবাস ছিল।
সুফী-দাঈদের ভূমিকা

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে সুফী ও দাঈদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁরা প্রেম ও মানবতার বাণী নিয়ে এ দেশে এসে স্থানীয় মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন।
শাহ মুহাম্মদ সুলতান বলখী (রহ.)

মধ্য এশিয়ার বলখের শাসক শাহ মুহাম্মদ সুলতান বলখী (রহ.) রাজ্যশাসন ত্যাগ করে ১০৪৭ খ্রিস্টাব্দে নৌপথে সন্দ্বীপ হয়ে বাংলায় আসেন। তিনি বগুড়ার মহাস্থানগড় অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন এবং সেখানে একটি মসজিদ ও ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন ।
শাহজালাল (রহ.) ও সিলেট বিজয়

বাংলার ইসলাম প্রচারের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত নাম হযরত শাহজালাল ইয়ামানী (রহ.) । ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ৩৬০ জন সঙ্গী নিয়ে সিলেটে আগমন করেন। তখন সিলেটের হিন্দু রাজা গৌরগোবিন্দ মুসলিমদের ওপর অত্যাচার করছিলেন। সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহের সেনাপতি সিকান্দার গাজী ও সাইয়েদ নাসিরুদ্দীনের সাথে শাহজালাল (রহ.) মিলে অভিযান চালিয়ে গৌরগোবিন্দকে পরাজিত করেন ।

সিলেট বিজয়ের পর শাহজালাল (রহ.) তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে সেখানেই অবস্থান করেন এবং তাঁর উন্নত চরিত্র, জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। ১৩৪১ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন এবং সিলেটের দরগাহ এলাকায় সমাধিস্থ হন।
অন্যান্য সুফী-দাঈ

শাহ মুহাম্মদ সুলতান রুমী (রহ.) : ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম হয়ে নেত্রকোণার মদনপুর অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন ।

শায়খ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ (রহ.) : ১২৭৮ সালে সোনারগাঁওয়ে ইলমে হাদীসের প্রথম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই উপমহাদেশের প্রথম হাদীস শিক্ষাকেন্দ্র ।

হযরত খানজাহান আলী (রহ.) : বাগেরহাটের শাসক ও ইসলাম প্রচারক। তিনি ১৫শ শতকে দীর্ঘশাটি মসজিদ, নয়গম্বুজ মসজিদসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ করেন।

ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয় (১২০৪ খ্রি.)

ঐতিহাসিকদের একটি অংশ মনে করেন, ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের মাধ্যমেই এ দেশে ইসলাম ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে। তিনি সেন বংশীয় রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে বাংলার সিংহাসন দখল করেন । তার বিজয়ের ফলে দিল্লি ও উত্তর ভারত থেকে বহু মুসলিম পণ্ডিত, দাঈ ও শাসনকর্তা বাংলায় আসেন এবং ইসলামের প্রসার ঘটে।

তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে, খিলজীর বিজয়ের আগেই সাহাবী, বণিক ও সুফীদের মাধ্যমে এদেশে ইসলামের বীজ বপন হয়ে গিয়েছিল। খিলজীর বিজয় সেই প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও সুসংহত করে।
বাংলায় ইসলামের স্বরূপ

বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান সুন্নি এবং তারা হানাফি মাযহাব অনুসারী। এছাড়া দেওবন্দি, বেরলভি ও সালাফি মতবাদের অনুসারীরাও রয়েছেন । এদেশের ইসলামী সংস্কৃতিতে সুফীবাদ ও আউলিয়াদের প্রভাব গভীর। প্রতি বছর টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম সমাগম।
উপসংহার

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। সপ্তম শতকে সাহাবীদের আগমন থেকে শুরু করে সুফীদের প্রেমের বাণী এবং খিলজীর শাসনামল পর্যন্ত এক বিস্তৃত ধারায় এদেশের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। লালমনিরহাটের ৬৯ হিজরির মসজিদ থেকে সিলেটের শাহজালালের দরগাহ—প্রতিটি নিদর্শন আমাদের জানান দেয়, ইসলাম এ দেশের মানুষের কাছে এসেছে শান্তি, মানবতা ও প্রেমের সেতুবন্ধন হিসেবে।

24

No comments yet. Be the first to comment!

এই এন্ট্রিটি রেট করুন
আপনার মতামত আমাদের জানান (১-৫ স্টার)
0.0 / 5.0 (0 রেটিং)

রেটিং দিন

এই এন্ট্রিটি রেট করুন
আপনার মতামত আমাদের জানান (১-৫ স্টার)
0.0 / 5.0 (0 রেটিং)
রেটিং বিতরণ
5
0
4
0
3
0
2
0
1
0
24
ভিউ
0
লাইক
0
শেয়ার
0
এডিট