বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অধিকারের অন্বেষণ

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অধিকারের অন্বেষণ

বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময় জনপদ। এখানে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বসবাস করে আরও অনেক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, যাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনধারা ও ঐতিহ্য রয়েছে। সরকারি পরিভাষায় এদের বলা হয় ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ বা ‘উপজাতি’। ২০২২ সালের আদমশুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ৫০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস, যাদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৬,৫০,১৫৯ জন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ।

এই নৃ-গোষ্ঠীগুলোর অধিকাংশই পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলে বাস করে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, গারো, মণিপুরী, খাসিয়া, তঞ্চঙ্গ্যা, মুরং-সহ আরও অনেক সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যের ধারক হয়ে আছেন। এই নিবন্ধে আমরা তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, বর্তমান চ্যালেঞ্জ এবং ‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে চলমান বিতর্কের গভীরে যাব।
কে এই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা? একটি পরিচিতি

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোকে ভাষাগত ও ভৌগোলিক দিক থেকে কয়েকটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা যায়। এরা চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল, উত্তরের সমতলভূমি ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠী

পার্বত্য চট্টগ্রাম এই নৃ-গোষ্ঠীগুলোর সবচেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যময় আবাসভূমি। এখানে বসবাসকারী প্রধান জনগোষ্ঠীগুলো হলো:

চাকমা: এরা দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী চাকমা জনসংখ্যা প্রায় ৪,৮৩,২৯৯। চাকমাদের নিজস্ব লিখিত ভাষা আছে, যা ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবারের অন্তর্গত। এরা প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। চাকমা সমাজে ‘চাকমা রাজা’ বা ‘সরদার’ শীর্ষক একজন প্রধানকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। চাকমা নারীরা ‘পিনন’ ও ‘খাদি’ নামক পরিচ্ছদ পরেন এবং পুরুষেরা ‘ধুতি’ পরিধান করেন। এদের ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি হলো ‘কার্পাস ঝুম চাষ’।

মারমা: চাকমাদের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী মারমা। এদের জনসংখ্যা প্রায় ২,২৪,২৬১। মারমারা মায়ানমার (প্রাচীন নাম বার্মা) থেকে আগত। এদের সংস্কৃতি ও জীবনধারায় বার্মিজ প্রভাব স্পষ্ট। মারমা ভাষা ও লিপি বার্মিজ লিপি থেকে এসেছে। এরা থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। মারমাদের প্রধান উৎসব ‘সাংগ্রাই’—বৌদ্ধ নববর্ষ বরণের উৎসব, যেখানে একে অপরের গায়ে জল ছিটিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করা হয়।

ত্রিপুরা: ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ১,৫৬,৫৭৮। এদের ভাষার নাম ‘ককবরক’। ত্রিপুরাদের প্রধান উৎসব ‘বৈশু’। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে এদের গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে।

তঞ্চঙ্গ্যা: তঞ্চঙ্গ্যারা পার্বত্য চট্টগ্রামের আরেকটি প্রাচীন জনগোষ্ঠী। এদের জনসংখ্যা প্রায় ৪৫,৯৭২। মায়ানমারের আরাকান অঞ্চল থেকে ১৮১৯ সালের দিকে এরা বাংলাদেশে আসে। বর্তমানে এরা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় বসবাস করে।

মুরং (ম্রো): মুরং জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৫২,৪৫৫। এরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত। ১৪-১৫ শতকে মায়ানমারের আরাকান থেকে আগত বলে ধারণা করা হয়। এদের নিজস্ব লিখিত ভাষা না থাকলেও অনেকেই বার্মিজ ও বাংলা লিপি পড়তে পারেন।

এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে বম, খিয়াং, খুমি, পাংখো, লুসাই, চাক, রাখাইন প্রভৃতি ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।
উত্তরবঙ্গের সমতলের জনগোষ্ঠী

উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নওগাঁ, রাজশাহী অঞ্চলে বসবাসকারী সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা, মাহালি, ভূমিজ প্রভৃতি জনগোষ্ঠী এ অঞ্চলের প্রধান নৃ-গোষ্ঠী।

সাঁওতাল: সাঁওতালরা উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় নৃ-গোষ্ঠী। এদের জনসংখ্যা প্রায় ১,২৯,০৪৯। সাঁওতালরা আদি অস্ট্রিক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর বংশধর। এদের জীবনপ্রণালী প্রকৃতির অতি নিকটে। ‘পাঁচি’, ‘পাঁচাতাত’ ও ‘মাথা’ নামক পোশাক এদের ঐতিহ্য। সাঁওতাল নারীরা রঙিন তুলোর শাড়ি পরেন এবং অলংকারে নিজেদের সাজান।

সাঁওতালদের বারোটি গোত্র আছে। এরা নবান্ন উৎসব ও সোহরায় উৎসব পালন করে। ‘হাড়িয়া’ বা পচা ধান থেকে তৈরি মদ এদের প্রিয় পানীয়। সঙ্গীত ও নৃত্যে এরা পারদর্শী। ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে সাঁওতালদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনগোষ্ঠী

সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে বসবাসকারী গারো, খাসিয়া, মণিপুরী, হাজং, কোচ প্রভৃতি জনগোষ্ঠী এ অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির ধারক।

গারো: গারো জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৭৬,৮৪৬। এদের অধিকাংশই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। গারোদের ‘আ’চিক’ ভাষা চীনা-তিব্বতি ভাষা পরিবারের অন্তর্গত। গারো সমাজ মাতৃতান্ত্রিক, যেখানে কন্যা সন্তান সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। গারোদের ‘ওয়ানগালা’ ও ‘মাংগোনা’ উৎসব উল্লেখযোগ্য।

খাসিয়া: খাসিয়ারা সিলেট ও মৌলভীবাজারের পাহাড়ি এলাকায় ‘পুঞ্জি’ নামে ছোট ছোট গ্রামে বসবাস করে। এদের ভাষা ‘খাসিয়া’ অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা পরিবারের অন্তর্গত। খাসিয়া সমাজও মাতৃতান্ত্রিক। এদের ঐতিহ্যবাহী পানপাতা ব্যবসা উল্লেখযোগ্য।

মণিপুরী: ১৮১৯-১৮২৫ সালের দিকে ভারতের মণিপুর রাজ্য থেকে আগত। এদের জনসংখ্যা প্রায় ২২,৯৭৮। মণিপুরীরা বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী। এদের ‘রাসলীলা’ নৃত্য বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। ‘বিষু’ বা ‘সানজেনবা’ এদের প্রধান উৎসব।
ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর ভাষাগত বৈচিত্র্য বিস্ময়কর। এথনোলগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩৬টি জীবন্ত ভাষা প্রচলিত রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৭টি চীনা-তিব্বতি, ১০টি ইন্দো-ইউরোপীয়, ৭টি অস্ট্রো-এশিয়াটিক ও ২টি দ্রাবিড় ভাষা।

প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পোশাক, অলংকার, খাদ্যাভ্যাস ও উৎসব সংস্কৃতি রয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের নৃ-গোষ্ঠীগুলোর প্রধান উৎসবগুলো হলো ‘বিজু’, ‘বৈশু’, ‘সাংগ্রাই’—যা বাংলা নববর্ষ বরণের সাথে মিলে যায়। পোশাকেও বৈচিত্র্য অসামান্য। খাবাং, থামি, লাংকান, খেও, খিয়োক—এসব নাম প্রতিটি জনগোষ্ঠীর পোশাকের স্বাতন্ত্র্যের পরিচায়ক।

এদের জীবনদর্শনে প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে। ঝুম চাষের মতো ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি এখনো টিকে আছে, যদিও বন সংরক্ষণ আইনের কারণে তা হুমকির মুখে।
পরিচয়ের রাজনীতি: ‘আদিবাসী’ বনাম ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর পরিচয় নিয়ে চলমান বিতর্ক অন্যতম সংবেদনশীল বিষয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এদের ‘আদিবাসী’ (Indigenous) হিসেবে অভিহিত করা হলেও বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই শব্দটি ব্যবহার করে না। সরকারি ভাষায় এরা ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ বা ‘উপজাতি’ (Upajati)।
‘আদিবাসী’ শব্দটির উত্থান

১৯৯০-এর দশকে জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের প্রভাবে বাংলাদেশেও ‘আদিবাসী’ পরিচিতি আন্দোলন শুরু হয়। নানা আদিবাসী অধিকার সংগঠন ও নেটওয়ার্ক এই শব্দটিকে তাদের একীভূত পরিচয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম-সহ সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি করে আসছে।

অভিযোজনের সমর্থকেরা বলেন, এই জনগোষ্ঠীগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আদিবাসী হওয়ার সবগুলো বৈশিষ্ট্যই বহন করে—স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমির সাথে বিশেষ সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কনভেনশন ১৬৯-এ আদিবাসীদের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, সেটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও প্রযোজ্য বলে তারা দাবি করেন।
সরকারের অবস্থান

অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার মনে করে ‘আদিবাসী’ শব্দটি প্রয়োগ করা ‘জাতীয় ঐক্যের পক্ষে হুমকি’ হতে পারে। সরকারের যুক্তি হলো, বাঙালিরা নিজেরাই এই ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা। তারা আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক নৃ-গোষ্ঠী মায়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ১৬ শতকে এসেছে।

২০০৭ সালে জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার সনদ (UNDRIP) থেকে বাংলাদেশ বিরত থাকে। সরকারের দাবি, এই সনদ স্বীকৃতি দিলে ভূখণ্ড ও সম্পদের অধিকার নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিককালে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০’ সংশোধনের প্রস্তাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশোধিত খসড়ায় ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটিকে ‘জাতিগত বৈচিত্র্য’ (Ethnic Diversity) নামে পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আপোষের কোনো পথ আছে কি?

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শব্দ নিয়ে বিতর্কের চেয়ে মূল বিষয়—অধিকার নিশ্চিতকরণে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। লেখক ও সাংবাদিক মং সিংহাই মারমা বলেন, “আইনের নাম ‘আদিবাসী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন’ হলে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আধুনিক হবে”। নিউজিল্যান্ডের মাওরি জনগোষ্ঠীর উদাহরণ টেনে অনেকে মনে করেন, নিজেদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখেও জাতীয় ঐক্য অটুট রাখা সম্ভব।
জমি ও ভূস্বত্ব: সবচেয়ে বড় সংকট

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ভূমি ও ভূস্বত্ব সংক্রান্ত নিরাপত্তাহীনতা। উত্তরবঙ্গের সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এটি প্রকট।
সমতলের ভূমি সমস্যা

ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার গারো, হাজং ও অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভূমি নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে। অনেকের নাম জমির দলিলে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পিতার মৃত্যুর পর নাম হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে উত্তরাধিকারীরা ভূমি হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন।

মধুপুরের শালবন এলাকায় গারো সম্প্রদায়ের চাষের জমি প্রায়ই বন বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়। ভূমির মূল্য বাড়ার সাথে সাথে বাইরের লোকেরা দখল নিতে উদ্যত হয়। এদের কাছে লিখিত দলিল না থাকায় আদালতেও ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী নেভিগেটর সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের জন্য জমি রক্ষা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১৬ সালে দিনাজপুরের বাগদা ফার্ম থেকে পুলিশি অভিযানে ২৫০০ সাঁওতাল ও বাঙালি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। ওই ঘটনায় তিনজন সাঁওতাল নিহত হন। বর্তমানে সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল (EPZ) স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা আবারও উচ্ছেদের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি সমস্যা

পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘ঝুম’ চাষের ঐতিহ্যবাহী ভূমি ব্যবহারের পদ্ধতি বন আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। ‘দ্যা ফরেস্ট (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০০০’-এর অধীনে সংরক্ষিত বনভূমিতে চাষাবাদ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে তঞ্চঙ্গ্যা, মুরং ও অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষিভূমি হারাচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে খাস জমির পরিমাণ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি হিসেবের মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। এই জমি দখল ও অবৈধ দখলদারি দূর করতে আইনি কাঠামো আরও জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি

ভূমি সমস্যার মতোই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নৃ-গোষ্ঠীগুলোর অবস্থা উদ্বেগজনক। আদিবাসী নেভিগেটরের জরিপে দেখা গেছে, অনেক শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়লেও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় পৌঁছানোর হার খুবই কম। দারিদ্র্য, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব ও সামাজিক চাপ এতে প্রধান বাধা।

স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও এরা পিছিয়ে। অনেক এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র দূরবর্তী, ভাষাগত যোগাযোগের সমস্যা রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাপদ্ধতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সামাজিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নেও পিছিয়ে এরা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাঁওতাল নারীরা ধর্ষণ, অপহরণ ও মামলার মতো সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মুসলিম সংখ্যালঘু সদস্যদের বিরুদ্ধেও সহিংসতার ঘটনার তথ্য রয়েছে।
নারী ও নেতৃত্ব

নৃ-গোষ্ঠীগুলোর নারীরা দ্বিগুণ বৈষম্যের শিকার। একদিকে জাতিগত সংখ্যালঘু, অন্যদিকে নারী। গারো ও খাসিয়াদের মতো মাতৃতান্ত্রিক সমাজেও নারীরা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছিয়ে রয়েছেন।

অন্যদিকে, নারী সংগঠনগুলো পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের হিল উইমেন ফেডারেশন ও সমতলের নারী সংগঠনগুলো জমি, অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে কাজ করে যাচ্ছে।

তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বও উল্লেখযোগ্য। তরুণ নৃ-গোষ্ঠীরা আর প্রান্তিকতার মধ্যে থাকতে চান না। তাঁরা শিক্ষা, চাকরি, নীতিনির্ধারণের সব স্তরে অংশ নিতে চান। মণিক সোরেনের মতো তরুণ নেতারা আদিবাসী নেভিগেটরের মতো আন্তর্জাতিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত হয়ে নিজ সম্প্রদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশ

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নিয়ে বিতর্ক শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৭ সালে জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার সনদ (UNDRIP) থেকে বাংলাদেশ বিরত থাকলেও ২০২২ সালের মধ্যে অন্তত ১৫টি আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশে আদিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করছে।

নিউজিল্যান্ডের মাওরি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনা টেনে অনেকে মনে করেন, সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া জাতীয় ঐক্যের জন্য হুমকি নয়। ১৮৪০ সালের ওয়াইটাঙ্গি চুক্তির মাধ্যমে মাওরিদের অধিকার স্বীকৃত, যা নিউজিল্যান্ডের সামাজিক স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রেখেছে।

অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংহতি প্রকাশের ‘উলুরু স্টেটমেন্ট ফ্রম দ্য হার্ট’ উদ্যোগও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক।
উপসংহার: একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের দিকে

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলো দেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আমাদের জাতীয় সম্পদ। তবে এই সম্পদ সংরক্ষণে তাঁদের ভূমি, শিক্ষা ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

‘আদিবাসী’ নাকি ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’—এই বিতর্কের সমাধান জরুরি, তবে তার চেয়ে জরুরি হচ্ছে ভূমির অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। লেখক হাসান এ শফি যেমন বলেছেন, “সব সম্প্রদায়ই নৃতাত্ত্বিক অর্থে ‘নৃ-গোষ্ঠী’”।

২০২৫ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি গ্রাফিতিতে লেখা হয়েছিল: “এই দেশ কোনো এক গোষ্ঠীর নয়। এটি সবার”। এই চেতনা বাস্তবায়িত হোক—যেখানে সব নৃ-গোষ্ঠী তাদের স্বকীয়তা নিয়ে গর্ব করতে পারে, যেখানে কেউ প্রান্তিক নয়, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত হয়।

তথ্যসূত্র

১. Mahmudul H Sumon. "Politics of recognition of ‘adivasis’ in Bangladesh". New Age BD, 20 March 2026.

২. "Ethnic minorities in Bangladesh". Wikipedia.

৩. "Indigenous Navigator: a new era for Indigenous Peoples in Bangladesh". Indigenous Navigator, 7 October 2025.

৪. "Indigenous peoples in Bangladesh". Wikipedia.

৫. HM Nazmul Alam. "Debates over identity". New Age BD, 27 February 2026.

৬. "The Idiosyncratic tradition of ethnic people of Bangladesh". Beautiful Bangladesh.

৭. "Small Grant in Bangladesh to address land and cultural rights of Indigenous Peoples". Indigenous Navigator, 29 April 2025.

৮. Mong Sing Hai Marma. "The future of indigenous recognition in Bangladesh". Asia News Network, 8 July 2025.

৯. Sayed Ibn Rahmat. "The migration of small ethnic groups to Bangladesh and their original habitats". Parbatta News, 20 March 2026.

১০. Dr Makhan Lal Dutta. "Quiet crisis of ethnic land rights". New Age BD, 20 March 2026.

22

No comments yet. Be the first to comment!

এই এন্ট্রিটি রেট করুন
আপনার মতামত আমাদের জানান (১-৫ স্টার)
0.0 / 5.0 (0 রেটিং)

রেটিং দিন

এই এন্ট্রিটি রেট করুন
আপনার মতামত আমাদের জানান (১-৫ স্টার)
0.0 / 5.0 (0 রেটিং)
রেটিং বিতরণ
5
0
4
0
3
0
2
0
1
0
22
ভিউ
0
লাইক
0
শেয়ার
0
এডিট